অটোরিক্সায় অবৈধ লাইসেন্স সরবরাহ করে হাজার কোটি টাকা লুটপাট!

অটোরিক্সায় অবৈধ লাইসেন্স সরবরাহ করে হাজার কোটি টাকা লুটপাট!

আইন ও প্রশাসন প্রধান সংবাদ স্থানীয় বার্তা
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সিডব্লিউ প্রতিবেদন::

টেম্পু টেক্সি এবং রিক্সার যুগ পার করে কক্সবাজার শহরের আভ্যন্তরীণ সড়ক পথে যোগাযোগের জন্য একমাত্র জনপ্রিয় এবং সাশ্রয়ী যন্ত্রযান হলো টমটম তথা ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা। বছর দশেক ধরে ব্যাটারি চালিত এই তিন চাকার যান শুধুমাত্র কক্সবাজার শহরেই নয় সারা জেলাজুড়ে অসংখ্য গ্রামীণ জনপদেও হয়ে উঠেছে বেশ জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ বান্ধব, কর্মসংস্থানমূখী এবং সাশ্রয়ী দরে যাতায়াতের জন্য এর প্রয়োজনীয়তা কক্সবাজারের জনগোষ্ঠীর কাছে মৌলিকত্ব লাভ করলেও একে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে কিছু অসুবিধা, সমস্যা এবং নানামুখী ফায়দা হাসিলকারী সিন্ডিকেটের বেপরোয়া অশুভ তৎপরতা। কোনো কোনো কর্তৃপক্ষ এটাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণামূলক লাইসেন্স বাণিজ্য করে হাতিয়ে নিয়েছে হাজার কোটি টাকা। এমনও দেখা গেছে- গাড়ির মূল্য যেখানে ৮৫ হাজার টাকা সেখানে চক্রটি লাইসেন্স দেওয়ার নামে প্রতিটি গাড়ি হতে মাথা পিছু পকেটে ভরেছে ১লক্ষ ৭০হাজার টাকা করে।

অনুসন্ধানে জানা যায়- বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ছাড়া ব্যাটারি চালিত এই তিন চাকার যানের লাইসেন্স দেওয়ার এখতিয়ার কারওই নেই। তবও সম্পূর্ণভাবে আইন লঙ্ঘন করে নিজেদের অর্থায়নে নাম্বার প্লেট তৈরি করেছে একাধিক কর্তৃপক্ষ। কথিত বৈধতা দেওয়ার আশ্বাসে এসব নাম্বার প্লেট তথা লাইসেন্স প্লেট সরবরাহ করা হয়েছে ৪০ হাজার অটোরিক্সায়। আর এর বিনিময়ে প্রতিটি লাইসেন্সের পেছনে কয়েক লাখ টাকা করে ২০ হাজার অটো রিক্সা থেকে কয়েকশো কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একাধিক সিন্ডিকেট। এর সাথে জড়িত রয়েছে কক্সবাজার পৌরসভা, সদর ইউনিয়ন ঝিলংজা এবং অন্যান্য উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ কেন্দ্রিক গড়ে উঠা বেশ কিছু অসাধু চক্র।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কক্সবাজার পৌরসভা শহরে এসব অবৈধ লাইসেন্স বিক্রি করেছে ২হাজার ৫শ’টি। এর বাইরে এসব লাইসেন্স কপি করে আরও নতুন নতুন লাইসেন্স প্লেট বানিয়ে বিক্রি করা হয়েছে কমপক্ষে ৭ হাজার অটোরিক্সার মালিককে। এভাবে সদর ইউনিয়ন ঝিলংজায় কমপক্ষে আড়াই হাজার, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত উখিয়াতে বিক্রি হয়েছে ৭হাজার, টেকনাফে সাড়ে ৩হাজার, চকরিয়াতে ৩হাজার, মহেশখালীতে ৫হাজার, বৃহত্তর ইদগাওতে ৬হাজার, রামুতে দেড় হাজার। হাইওয়ে, ট্রাফিক, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং এসব গাড়ি বিক্রয়কারী ১৫টি প্রতিষ্ঠান তথা শো রুমে খোঁজ নিয়ে এ পরিসংখ্যান পাওয়া যায়।

এদিকে ব্যাটারি চালিত তিন চাকার অটোরিক্সা সমূহকে কথিত লাইসেন্স সরবরাহের ব্যাপারে জানতে চাইলে পৌরসভা বলছে- মাত্র ৬হাজার টাকার বিনিময়ে এসব লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। গাড়ির মালিকেরা কেনো ১লক্ষ ৭০ হাজার টাকা দিয়ে এসব লাইসেন্স ক্রয় করেছে তারা বলতে জানেন না। কিন্তু এসব লাইসেন্স কীসের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে এবং তা কতটুকু বৈধ এসব প্রশ্নের জবাবে কোনো সদুত্তোর দিতে পারেনি কর ও লাইসেন্স শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল হক। এছাড়াও সদর ইউনিয়ন ঝিলংজায় অটোরিক্সার লাইসেন্স সরবরাহ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান টিপু সুলতান জানান- তিনি ১১ আগস্ট ২০১৬ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরে কোনো লাইসেন্স দেননি। এর আগের চেয়ারম্যানরা এসব টমটম বা অটোরিক্সার অসংখ্য লাইসেন্স বিক্রি করেছে। যদিও এসব লাইসেন্স কোনো কাজে আসতো না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। হাইওয়ে পুলিশ এসব গাড়ি ধরে ফেলতো। তবে অন্যান্য ইউনিয়ন পরিষদগুলোর মধ্যে যেগুলো হাইওয়ে পুলিশের চলাচল নেই সেখানে ইনিয়ন পরিষদগুলো লাইসেন্স বিক্রি করে সুবিধা করতে পারছে বলেও জানান তিনি।

তাহলে কীভাবে বিক্রি হচ্ছে এই ১ লক্ষ ৭০হাজার টাকায় এসব ভুয়া লাইসেন্স:: জনগুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠা এই ব্যাটারি চালিত যানটির মালক চালকদের বেশিরভাগই হতদরিদ্র, শিক্ষা বঞ্চিত, আইন অসচেতন এবং ক্ষমতার কাছে ধরাশায়ী। এটাকে পুঁজি করে একটি লুটেরা চক্র সক্রিয় হয়ে উঠে। চক্রটি সংশ্লিষ্ট একাধিক সরকারি কর্তৃপক্ষকে প্রতারণার ফাঁদে জড়িয়ে ফেলে। এভাবে সেসব কর্তৃপক্ষ অটোরিক্সা বা টমটম মালিক চালকদের উপর কথিত লাইসেন্সের খড়গ বসায়। এবং তাদের এসব লাইসেন্স নিতে বাধ্য করে। এখানেই শেষ নয়। অত্যন্ত ভয়াবহ ব্যাপার হলো- কথিত এসব লাইসেন্স ওই চক্রটিই নির্দিষ্ট মূল্য ৬হাজার টাকা পরিশোধ করে আগে ভাগেই ক্রয় করে ফেলে। পরবর্তীতে কেউ যখন বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে হেনস্থার শিকার হন তখন বাধ্য হয়ে আক্রান্ত চালক কিংবা মালিক পৌরসভা কার্যালয়ের দ্বারস্থ হন। সেখানেই প্রতারকদের জালে আটকা পড়েন চূড়ান্ত ভাবে। এভাবেই সেই ৬হাজার টাকা দামের এসব অবৈধ লাইসেন্স ১লক্ষ ৭০ হাজার টাকায় কিনে গাড়ির পেছনে লাগিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে বাধ্য নিরীহ মালিক চালকরা।

লাইসেন্স বিষয়ে কক্সবাজার সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর একাধিক উর্ধ্বত্বন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে- ব্যাটারি চালিত তিন চাকার এসব যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়ার একমাত্র এখতিয়ার বিআরটিএ’র। কিন্তু পৌরসভা বা অন্যান্যরা কীভাবে লাইসেন্স দিচ্ছে সেটি তারা জানে না। এবং যারা লাইসেন্স দিচ্ছে সম্পূর্ণ অনিয়ম করেই দিচ্ছে। গাড়িগুলোর লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে এখনও কোনো নীতিমালা বা আইন সরকারে তরফ থেকে আসেনি একারণেও বিআরটিএও আপাতত লাইসেন্স দিতে পারছে না।

‘লাইসেন্স’ এর ভিত্তিতে অটোরিক্সা ধরপাকড়ের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. রফিকুল ইসলাম জানান- গাড়িগুলো চলছে সম্পূর্ণভাবে মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে। এগুলোর লাইসেন্স বলতে এধরণের কোনো কিছুই নেই। আর যারা লাইসেন্স সরবরাহের নামে বিভিন্ন অপকর্ম করছে তাদের পর্যায়ক্রমে আইনের আওতায় আনা হবে। এখন যেসব অটোরিক্সা ধরপাকড় করা হচ্ছে সেগুলো শুধুমাত্র যানজট নিরসনের জন্য। এছাড়াও ড্রাইভিং লাইসেন্স লাগবে বলে যে তথ্যটি স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে তা গুজব। এধরণের কোনো লাইসেন্সের কথা জেলা পুলিশের সমন্বয় সভায় আলোচনা আনা হয়নি। তবে চালকদের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ভদ্রতার সাথে যাত্রীসেবা দিতে দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এবং যত্রতত্র গাড়ি পাকিং না করে যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট পরিবহণ শ্রমিক নেতাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *