অবৈধভাবে ফসলি জমি ভরাটের প্রতিবেদন করায় তিন সাংবাদিককে 'ভূমিদস্যুর' লিগ্যাল নোটিশ

অবৈধভাবে ফসলি জমি ভরাটের প্রতিবেদন করায় তিন সাংবাদিককে ‘ভূমিদস্যুর’ লিগ্যাল নোটিশ

আইন ও প্রশাসন প্রধান সংবাদ স্থানীয় বার্তা
  • 285
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    285
    Shares

নিজস্ব প্রতিবেদক::

কক্সবাজার সদরের বাঁকখালী নদীর তীরবর্তী উত্তর মুহুরীপাড়ার তিন ফসলি প্রায় ৬০ একর উর্বর জমি ভরাটের বিষয় নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন করায় তিন সাংবাদিককে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছেন ভূমিদস্যুতায় অভিযুক্ত এ এম জি ফেরদৌস।

বুধবার (১৭ মার্চ) এ এম জি ফেরদৌসের পক্ষ হয়ে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের জনৈক সাহাব উদ্দিন নামের অ্যাডভোকেট স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন আকারে লিগ্যাল নোটিশটি প্রকাশ করেন। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা ও জাগোনিউজের কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি সায়ীদ আলমগীর, আলোকিত কক্সবাজার’র অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশ ওয়াহিদুর রহমান রুবেল ও সমুদ্রকন্ঠ’র সম্পাদক ও প্রতিবেদক জসিম উদ্দীনের নামে প্রকাশ করা নোটিশে সংবাদটির বিন্দুমাত্র সত্যতা নেই বলে দাবি করে স্ব স্ব গণমাধ্যম থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদন প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে। নাহলে তিনি ২০ কোটি টাকার মানহানির মামলা করবেন বলে হুশিয়ারি দেন।

দেখা যায়, প্রকাশিত প্রতিবেদনটি স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকগণ কর্তৃক জেলা প্রশাসক, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক), কৃষি অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন জায়গায় করা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে করা। অভিযোগ পাওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কর্তা ব্যক্তি ও কৃষি বিভাগের বক্তব্য রয়েছে। তারা একবাক্যে স্বীকার করেছেন মহুরীপাড়ার তিন ফসলি অর্ধশতাধিক একর জমি ভরাট করার সরেজমিন সত্যতা পেয়েছেন। ইতোমধ্যে কউক ঘটনাস্থলে তাদের নির্বাহি ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে মাটি ভরাট বন্ধ করেছেন বলে দেয়া বক্তব্য প্রকাশিত নিউজে সংযুক্ত রয়েছে।

এ বিষয়ে ইত্তেফাক ও জাগোনিউজ প্রতিনিধি সায়ীদ আলমগীর বলেন, প্রকাশিত সংবাদে মিথ্যা তথ্য প্রচার হয়েছে এমন মনে করলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনি নোটিশ দিতে এবং প্রেস আইনে আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন, এটা ওনাদের সাংবিধানিক অধিকার। তবে, সংবাদের কোন অংশ মিথ্যে তা সুনির্দিষ্ট করে দেয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশ করা আইনি নোটিশটাতে আইনজীবী মক্কেলের বরাত দিয়ে যে তথ্যগুলো উপস্থাপন করে নিউজটি প্রত্যাহার করতে বলেছেন তা হাস্যকর।

সাংবাদিক সায়ীদ আলমগীর আরো বলেন, ওনি (নোটিশ দাতা) দাবি করেছেন তার ব্যবসায়ীক প্রতিপক্ষের দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে অফিসে বসেই মনগড়া ভাবে নিউজটি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু নিউজে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে ভরাটরত কৃষি জমির মালিকদের মাঝে ৩৩ জনের স্বাক্ষরে বিভিন্ন দপ্তরে দেয়া অভিযোগের তথ্যগুলো প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া একটি সরেজমিন পরিদর্শনের বিবরণের প্যারা রয়েছে।

যেখানে মাটি ভরাট কাজে নিয়োজিত শ্রমিকের বক্তব্য রয়েছে (তাদের বক্তব্য ও স্কেভেটর দিয়ে মাটি ভরাটের ভিডিও সংরক্ষিত আছে)। আইনজীবী আরো দাবি করেছেন তার মক্কেলের বক্তব্য নেয়া হয়নি এবং অভিযুক্ত এলাকার পরিবর্তে ভিন্ন এলাকার চিত্র প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি( আইনজীবী) পড়তে ভুলে গেছেন, তার মক্কেলকে ফোন করার পর ফোন না ধরায় খুদে বার্তা (এসএমএস) দেয়া রয়েছে। আর অভিযোগ ও অভিযুক্ত জায়গাটি যে সঠিক সে বিষয়ে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) চেয়ারম্যান লে. কর্ণেল ফোরকান আহমেদের স্পষ্ট বক্তব্য প্রতিবেদনে রয়েছে। ভূমিদস্যু হিসেবে চিহ্নিত ফেরদৌস নিজেকে পরিবেশ প্রেমী বলে দাবি করলেও পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে চলতি বছরের শুরুতে তার বিরুদ্ধে লাখ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর।

এছাড়াও শিশু বয়সে পটুয়াখালী থেকে কক্সবাজার এসে ইটভাটায় বাবুর্চি সহকারি হিসেবে কাজ শুরুর পর নানা পেশায় সময় দেয়া ফেরদৌস সর্বশেষ বাসের টিকেট বিক্রেতা থেকে এক দশকের ব্যবধানে কয়েশ কোটি টাকার মালিক বনে যাবার নানা কাহিনী ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের জমি হাতিয়ে নেয়া, কালো টাকা সাদা করতে লস্ দিয়েও বছরের পর বছর শপিংমলসহ নানা ব্যবসা চালানোর নানা তথ্য ওয়াকিবহাল মহল সরবরাহ করছে৷ এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরবর্তীতে সেসব বিষয় নিয়ে তথ্য বহুল প্রতিবেদনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন সায়ীদ আলমগীর।

একই কথা বলেন, প্রথম প্রতিবেদনে সহযোগী আলোকিত কক্সবাজার অনলাইনের সম্পাদক ও প্রকাশক ওয়াহিদ রুবেল এবং সমুদ্রকন্ঠ পত্রিকার প্রতিবেদক জসিম উদ্দিনও।

উল্লেখ্য, কক্সবাজারে দুই কিলোমিটার দূরত্বে গড়ে উঠা রেলস্টেশনকে কেন্দ্র করে বাঁকখালী নদীর তীরবর্তী উত্তর মুহুরীপাড়ার তিন ফসলি জমিতে বাণিজ্যিক চিন্তায় ‘আবাসন প্রকল্প’ গড়তেই আইন উপেক্ষা করে রাতে-দিনে কৃষি জমি ভরাট করছে ভূমিদস্যু চক্র।

শতাধিক কৃষক পরিবারের একমাত্র অবলম্বন তিন ফসলি জমি ভরাট থেকে রক্ষায় জেলা প্রশাসক, কৃষি বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন দেন ক্ষতিগ্রস্তরা।

‘কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার’ আইনে ফসলি জমি ভরাট করে কোনো স্থাপনা বা আবাসন প্রকল্প বা শিল্প কারখানা গড়ে তোলার কোনো সুযোগ নেই। কক্সবাজার কৃষি বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন মাটি ভরাট রদে উপযুক্ত ব্যবস্থা না নিলেও বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়ে প্রাথমিক কাজ বন্ধ করে দেয় কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এসব বিষয় নিয়ে ১৪ মার্চ (রবিবার) ইত্তেফাক, জাগোনিউজসহ নানা গণমাধ্যম সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনও। তারা ওইদিন সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থলে পাঠান বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত আবদুর রহমান ও কামরুল ইসলামসহ আরো অনেকে।

এদিকে খবর চাপা দিতে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্রিকা পাঁচ গুণ দামে কিনে নেন অভিযুক্তরা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা দোকানে এসে পত্রিকা না পেয়ে সৌজন্য কপি থেকে নিউজটি ফটোকপি করে নিয়ে গেছেন বলে উল্লেখ করেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এরপরই অভিযুক্তরা নিউজে তাদের সম্মান আন্তর্জাতিক ভাবে ক্ষুন্ন হয়েছেন দাবি করে নিউজ প্রত্যাহার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকদের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল এ্যাকশন নিতে আবদার করে আইনি নোটিশ দিয়েছেন।