কক্সবাজারে সহস্রাধিক অগভীর নলকূপ অকেজো, বিশুদ্ধপানির তীব্র সঙ্কট

আইন ও প্রশাসন প্রধান সংবাদ স্থানীয় বার্তা
  • 96
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    96
    Shares

শাহীন মাহমুদ রাসেল::

কক্সবাজার সদরসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নিচে নিমে যাওয়ায় ব্যক্তি মালিকানায় স্থাপিত পাড়া-মহল্লার অধিকাংশ টিউবওয়েলে পানি উঠছেনা। কিছু কিছু টিউবওয়েলে স্বল্প পরিমাণে পানি উঠেলেও পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে রীতিমত প্রতিযোগিতা করতে হয়। এতে বিশুদ্ধ পানিসহ ব্যবহারিক চাহিদা মেটাতে হিমসিম পড়তে হচ্ছে এইসব এলাকার বাসিন্দাদের।

এছাড়াও অকেজো হওয়ার উপক্রম হয়েছে উপজেলার এক হাজারেরও বেশি টিউবওয়েল (নলকূপ)। নদীতে সেচ পাম্প না বসিয়ে ডীপ পাম্প বসানোর কারণে টিউবওয়েল থেকে পানি উঠছেনা বলে স্থানীয়দের আভিযোগ।

এসব টিউবওয়েলে পর্যাপ্ত পানি না ওঠায় চরম দূর্ভোগের শিকার হয়েছেন উপজেলার কমপক্ষে ৫ হাজারেরও বেশি পরিবার। প্রচণ্ড খরতাপ, ভ্যাপসা গরম ও পানি সংকটে নেমে এসেছে অসহনীয় দুর্ভোগ। সোমবার (১৫ মার্চ) উপেজলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের মাষ্টার পাড়া, সুতারচর, ঘাটপাড়া, মুন্সিপাড়া, কোনারপাড়া, খামার পাড়া, সিকদার পাড়া, ডেইঙ্গাপাড়া ও হিন্দুপাড়াসহ বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, টিউবয়েলে পানি না ওঠার কারণে পুকুরের পানি দিয়েই চলছে হাজারও মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রম।

হঠাৎ দু-একটি বাড়িতে ভ্যাটিক্যালযুক্ত টিউবয়েল থাকলেও সেখানে একটু পানি নেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইনে উপচেপড়া ভিড় জমাচ্ছেন গৃহবধূরা। সামর্থবান অনেকে আবার টিউবয়েলে পানি পেয়ে সাব-মারসিবল পাম্পের মাধ্যমে পানি তোলার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু সেখানেও দেখা গেছে লম্বা লাইন।

মুন্সিপাড়া এলাকার ইরফান মুরশেদ, নাছির উদ্দিন, জসিম উদ্দিন পুতু ড্রাইভার, বিলকিছ বেগম, নাজমা বেগম, আইয়ুব আলী, ভ্যানচালক আবুল কালাম ও কৃষক গিয়াস উদ্দিনসহ অন্যরা জানান,

রাবারড্রাম নষ্ট হওয়ায় কতৃপক্ষ নদীতে বাঁধ দিতে নানানভাবে কালক্ষেপন করে। নদীতে পানি না দেখে ফসলের মাঠে সেচ দেওয়ার জন্য সেচ পাম্পের মালিকরা ডীপ পাম্প বসায়। এজন্যই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে টিউবওয়েলে পানি উঠা। পানির অপর নাম জীবন, সেই জীবনের ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে। তা-না হলে আমরা অল্প আয়ের মানুষ কেমন করে বাঁচবো? আমাদের তো ভ্যাটিক্যাল বসানোর টাকা নেই।

সেচ পাম্প মালিকরা জানান, চৈত্র মাস বোরো ধানে সেচের পিক সিজন। অব্যাহতভাবে পানির স্তর নিচে নামায় পানির তীব্র সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বোরো মৌসুমে সদরে সেচ মৌসুমে দেখা দিয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির তীব্র সংকট। মৌসুমের শুরুতেই বিভিন্ন ডীপ পাম্পেও পানি উঠছে না। সদরের বিভিন্ন অঞ্চলেও সেচের পানির তীব্র সংকট দেখা যেতে পারে।

ঝিলংজা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য জনপ্রতিনিধিরা পানি সমস্যার কথা স্বীকার করে জানান, খরুলিয়াসহ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে কম-বেশি সব জায়গায় পানি সমস্যা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়রা প্রায় প্রতিদিনই নলকূপ থেকে পানি ওঠানোর জন্য নতুন করে মাটি খোড়াসহ নানা কৌশল অবলম্বন করেছে। তবুও এর কোন প্রতিকার পাচ্ছেনা। তবে কিছু কিছু এলাকায় ভ্যাটিক্যালযুক্ত নলকূপে সামান্য কিছু টিউবওয়েলে পানি উঠলেও হাজারেরও বেশি টিউবয়েলে একে বারেই পানি উঠছে না। যে কারণে ক্রমান্বয়ে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এলাকায়।

পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, খাবার পানি, রান্না, গোসল, সেচসহ সব কাজে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল এই এলাকাগুলো। সুপেয় ও চাষাবাদের পানির চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই ব্যবহার হয় ভূগর্ভস্থ স্তর থেকে। ১৯৬৮ সালে যখন বাংলাদেশে ডিপ টিউবওয়েল বসানো শুরু হয়, তখন সর্বোচ্চ ৫০ ফুট নিচে টিউবওয়েল বসিয়েই পানি পাওয়া যেত। এখন ১৬০ ফুট বসিয়েও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

৩৫ বছর ধরে দেশের পানি নিয়ে গবেষণা করছে এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, বৃষ্টির পরিমাণ কমে নদী শুকিয়ে যাওয়াসহ নানা কারণে সেচের পাশাপাশি সুপেয় পানির পরিমাণও কমতে শুরু করেছে।

গত কয়েক বছরে জেলায় প্রায় কয়েক হাজার ডিপ টিউবওয়েল বসানো হয়েছে। কোনো নীতিমালা না মেনেই এসব ডিপ টিউবওয়েল বসানো হয়। এর ফলে পানির স্তর প্রায় ৩০ ফুট নিচে নেমে গেছে। সদরসহ আশপাশের এলাকায় পানির স্তর নেমে গেছে প্রায় ২৫ ফুট। এসব এলাকায় পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়ার কারণ হচ্ছে শিল্প-কারখানায় পানির যথেচ্ছ ব্যবহার।

গবেষকরা বলছেন, নদীগুলোতে অপরিকল্পিত বাঁধ, জলবায়ুর প্রভাবে প্রতি বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি ও বন্যা না হওয়া এবং দুয়েক বছর পর পর তীব্র খরা হওয়ার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে সংকট প্রকট হচ্ছে।

এভাবে পানির স্তর নামতে থাকলে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়বে। শহর, গ্রাম এবং শিল্প এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিয়ে বৃষ্টি বা উন্মুক্ত জলাধারের পানির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।